সব আলো নিভে যায়!

আকাশ ঘুম থেকে উঠেছে কিছুক্ষন আগে। আড়মোড়া ভেঙ্গে টেনে নিলো সেলফোনটা। ঘুমানোর সময় আকাশ সেলফোন বিছানা থেকে একটু দূরে টেবিলের উপর রাখে যাতে ঘুমের সময় রিং বেজে উঠলে ঘুমের খুব একটা ক্ষতি না হয়। গতকাল রাতেও একি ভাবে টেবিলের উপরেই রেখেছিল। একটু অলস ভাবেই সেলফোনটা হাতে নিয়ে আঁতকে উঠলো আকাশ। ১৭ টা মিসড কল। সবগুলোই বাবার নাম্বার থেকে এসেছে। কোনও অঘটন ঘটলো না তো? বুকের মধ্যে ইথিওপিয়ান উপজাতীয় বিট বাজতে থাকলো যেন। ভয়ে ভয়ে কল ব্যাক করলো আকাশ।

“হ্যালো বাবা?”
“কোথায় ছিলি গাধা?”
“কি হয়েছে বাবা? কোন সমস্যা?”
“সমস্যা তো বটেই। আগে বল কোথায় ছিলি?”
“বাবা ঘুমাচ্ছিলাম। সাইলেন্ট করা ছিল টের পাই নি। কি হয়েছে বলো না?”
“সবথেকে বড় সমস্যা হল তোর মতো একটা গাধা জন্ম দেওয়া। হ্যাপি বার্থ ডে গাধা। সেই রাত ১২ টা ১ মিনিট থেকে ট্রাই করছি। আমার তো বয়স হয়েছে নাকি? রাত জেগে তোকে উইশ করার জন্য বসে থাকবো আর তুই নাক ডেকে ঘুমাবি!”
“ওহ! তাই বলো। আমি তো ভয় পেয়েছিলাম। যাই হোক গাধা তো তুমিই জন্ম দিয়েছো। তাই একটু আধটু ভোগ তো তোমাকেও করতে হবে”।
“হ্যাঁ তাতো ভুগছি। এখন বাপজান বলেন আপনার কি গিফট লাগবে? দয়া করে আমার সাধ্যের মধ্যে বইলেন। যদিও জানি আপনার সাধ কখনোই আমার সাধ্যে আঘাত করে নি, তবু একটু মনে করিয়ে দিলাম”।
“উম্মম, এখন তো দশটা বাজে, আমি হাত মুখ ধুয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে বের হচ্ছি। ঠিক একটার মধ্যে তোমার সামনে হাজির হবো। দয়া করে একটু ভালো কিছু রান্না করে রেখো। একসাথে খাবো, তারপর দেখা যাবে কি চাওয়া যায়”।
“জো হুকুম গাধা”।

হাসান সাহেবের একমাত্র ছেলে আকাশ। আকাশের বয়স যখন মাত্র দুই বছর তখন আকাশের মা মাড়া যায়। পড়ে আর বিয়ে করেননি তিনি। আকাশ কে বড় করে তোলাটাই ছিল তার মূল কাজ। দুজনের মধ্যে একেবারে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। আকাশ ও তার বাবার সম্পর্ক দেখে ঈর্ষান্বিত হয় আকাশের সব বন্ধুরাই। বাবাই আকাশের সবথেকে বড় বন্ধু। মা কে ঠিক মনে নেই আকাশের। তার কিছু ছবি ছাড়া আকাশের কাছে তার মায়ের আর কোনও স্মৃতিই নেই।

আকাশ তখন মনে হয় বছর সাতেকের হবে, হাসান সাহেবের দুম করে চাকরি চলে গেল। ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুব একটা মজবুত কখনোই ছিল না হাসান সাহেবের। বেশ বিপদেই পরেছিলেন তিনি তখন। এর মধ্যে একদিন আকাশ আবদার করে বসলো তার একটা সাইকেল লাগবে। ছেলের কোন আবদার অগ্রাহ্য করার মতো সাহসী হাসান সাহেব কখনোই ছিলেন না। কিন্তু চাকরি নেই, ব্যাংকে টাকা নেই। হাসান সাহেব বাধ্য হয়ে তার বড় ভাইকে ফোন করলো। কিছু টাকা চাইলো তার কাছে। ওপাশ থেকে ঠিক কি বলেছিল আকাশ জানে না। শুধু দরজার ফাঁক থেকে দেখেছিল তার বাবার চোখে জল। কি বুঝেছিল আকাশ কে জানে। আস্তে করে সরে গিয়ে খুব কেঁদেছিল। বিকেলে বাবার কাছে গিয়ে বলল-

“বাবা আমি সাইকেল কিনবো না”।
“কেন রে বদমাশ?”
“বাবা আমার বন্ধু আছে না রতন, ও না সাইকেল নিয়ে অ্যাকসিডেন্ট করে হাত ভেঙ্গে ফেলেছে। খুব ব্যাথা নাকি হয় হাত ভাঙ্গলে। আমার ও যদি ভেঙ্গে যায়। আমার সাইকেল দরকার নেই বাবা”।

বাবা আকাশকে বুকে জড়িয়ে ধরেছিল। কিছু বলতে পারেননি। শুধু দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বুঝে নিয়েছিলেন তার এতটুকুন পিচ্চি বাবাটা বড় হতে শুরু করেছে। আজ প্রায় দুমাস পড়ে আকাশ বাড়ি আসবে। ছেলেটা পড়াশুনায় এতই ব্যস্ত থাকে ঠিক মতো বাড়ি আসতে পারেনা। বিশ্ববিদ্যালয়ে আকাশের খুব নাম ডাক। কখনো সেকেন্ড হতে হয়নি তাকে। আগাগোড়াই ফার্স্ট। তাই টিচাররাও আকাশ কে খুব পছন্দ করে। হাসান সাহেব মাঝে মাঝে গিয়ে দেখা করে আসে আকাশের সাথে। আগামী মাসে আকাশ এর ফাইনাল পরীক্ষা। বেশ ধকল যাচ্ছে আকাশের উপর দিয়ে। পড়াশুনার চাপ অনেক। আকাশ খিচুড়ি খেতে খুব পছন্দ করে। হাসান সাহেব খুব যত্ন করে খিচুড়ি আর গরুর মাংস ভুনা করে রেখেছে। আর বেগুন কেঁটে হলুদ দিয়ে রেখেছে। আকাশ এলে গরম গরম ভেজে দিবেন। বেশ বড়সড় একটা ডিপার্টমেণ্টাল স্টোর চালান হাসান সাহেব। একটু একটু করে দাড় করিয়েছেন তিনি আর আকাশ মিলে। আজ তিনি যাবেন না। ম্যানেজার কে বলে দিয়েছেন সামলে নিতে। আজ দিনটা আকাশের সাথেই কাটাবেন।

হাসান সাহেব তখন কেবল দোকানটা শুরু করেছেন। ছোট একটা মুদি দোকান। প্রথম প্রথম বেশ লজ্জা করতো হাসান সাহেবের দোকানে যেতে। কিন্তু সকালে ঘুম থেকে উঠে বুকের মধ্যে গুটিসুটি হয়ে ঘুমানো আকাশের মুখ দেখলে সব কিছু ভুলে যেতেন। ছেলেটার ভবিষ্যৎ গড়ে দিতে হবে। লজ্জা পেলে হবে না। ছেলেকে স্কুলে দিয়ে এসে দোকান খুলতেন তিনি। কাছাকাছিই থাকতো হাসান সাহেবের বড় ভাই। নিজের গাড়ি ছিল তার। বড় ব্যবসায়ী। হাসান সাহেবের দোকানের সামনে থেকেই যেতেন। কিন্তু ভুলেও ফিরে তাকাতেন না দোকানের দিকে। পাছে ইজ্জত চলে যায়। হাসান সাহেবের প্রথম প্রথম বেশ কষ্ট লাগতো। একটু একটু করে ঘামে ভিজিয়ে দোকান বড় করেছে হাসান সাহেব। এখন বিশাল আকার ধারন করেছে তার সেই ছোট্ট মুদি দোকান। ১৫ জন কর্মচারী কাজ করে তার স্টোর এ এখন। এলাকায় তাকে সবাই খুব সম্মান করে। তবে এই সম্মান আগেও ছিল। নিখাঁদ ভালো মানুষ হিসেবে হাসান সাহেবের বেশ কদর এলাকায়, সাথে তার জ্ঞানের কদর ও করে সবাই। আশেপাশের কেও কোন সমস্যায় পড়লে তার কাছে আসে বুদ্ধি নিতে।

সাড়ে বারোটার মতো বাজে। হাসান সাহেব আকাশের জন্য একটা আইপ্যাড কিনেছেন। জন্মদিনের উপহার। ছেলেটা টিউশনি করে একটু একটু করে টাকা জমাচ্ছে একটা আইপ্যাড কিনবে বলে। আজ তাকে ভড়কে দেওয়া যাবে। গাধাটা বাপের কাছে কখনোই কিছু চায় না। আইপ্যাড টা ভালো করে র‍্যাপিং করে আকাশের টেবিলের উপর রেখে দিয়েছেন। আকাশ কে প্রথম যেদিন ফোন কিনে দিয়েছিলেন সেদিনের কথা আজ খুব মনে পরছে হাসান সাহেব এর। আকাশ বিশ্ববিদ্যালয়ে চান্স পাওয়ার পর প্রথম বাড়ি থেকে যেদিন ঢাকা যাচ্ছে তখন আকাশের কোনও ফোন ছিল না। কখনো চায় নি আকাশ। যখন আকাশ চলে যাচ্ছে ব্যাগ নিয়ে তখন হাসান সাহেব আকাশ কে বললেন-

“পৌঁছে একটা ফোন দিস কিন্তু”।
“ঠিক আছে বাবা। তুমি চিন্তা করো না। আমি পৌঁছেই ফোন দিবো”।
“আচ্ছা এক বার ও ভেবেছিস আমার যখন তোর সাথে খুব কথা বলতে ইচ্ছে করবে তখন আমি কি করবো?”
“আমি তো তোমাকে ফোন করবো বাবা”।
“সে তো তোর যখন ইচ্ছে করবে তখন। কিন্তু আমার ইচ্ছের কি কোনও মূল্য নেই?”
“আচ্ছা দেখি কি ব্যাবস্থা করা যায়”।
“কি করবি শুনি?”
“দেখি হলের কারো নাম্বার তোমাকে দিবো। তুমি তাকে ফোন করে আমাকে চেয়ে নিয়ো”।
“গাধা তাও একটা ফোন আমার কাছে চাইতে পারিস না?”
“আচ্ছা পরের বার যখন আসবো তখন একটা কিনে দিয়ো। এখন দেরি হয়ে যাচ্ছে। বাস ছেড়ে দিবে। তুমি তোমার খেয়াল রাইখো কিন্তু। ঠিক মতো খাওয়া দাওয়া করবা”।
“আচ্ছা যা তুই। আর তোর ব্যাগের পকেটে একটা ফোন আছে। বাসে উঠে ওইটা অন করে নিস। তুই গাধা গাধাই থেকে গেলি”।
“ধুর তুমি খালি নাটক করো। বয়স হইছে এখন এই ভণ্ডামি ছাড়ো। এইগুলান করার বয়স আমার, তোমার না বুড়ো খোকা”।
“কি যে বলিস। এখনো ও তোর বয়েসি মেয়েরা রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় ঘুরে ঘুরে আমাকে দ্যাখে। আর তুই বলিস আমি বুড়ো হয়ে গেছি”।
“এহ, তোমারে দিকে তাকায় কারন দেখে নেয় শ্বশুর কেমন হবে”।
“ওহ এখন তোর বাস ছাড়বে না? ভাগ এইখান দিয়ে”।

হাসতে হাসতে চলে গিয়েছিলো আকাশ। হাসান সাহেবের মুখে এক চিলতে হাঁসি ফুটে উঠলো সেই স্মৃতি মনে করে। পকেট থেকে ফোন বের করলেন। এতক্ষনে চলে আসার কথা আকাশের। ফোন করলেন, কিন্তু নাম্বার বন্ধ। এমনটা তো কখনো হয় না। আকাশ তো কখনো ফোন বন্ধ রাখে না। এদিক থেকে ও খুব কেয়ারফুল। কতটুকু চার্জ থাকলে কতো সময় চলবে খুব ভালো করে জানে। তাই চার্জ শেষ হয়ে গিয়ে ফোন বন্ধ হয়ে যাওয়ার তো কথা না। পাঁচ মিনিট পর আবার ফোন করলেন কিন্তু নাম্বার বন্ধ। দেশের যা পরিস্থিতি হাসান সাহেবের টেনশন হওয়াটাই স্বাভাবিক। চারিদিকে যেভাবে গাড়িতে পেট্রোল বোমা মারছে, গাড়ি ভাংচুর করছে তাতে রাস্তায় কেও নিরাপদ না। বাড়ির আঙ্গিনায় পায়চারি করছে হাসান সাহেব। কপালে একটু একটু ঘাম জমতে শুরু করেছে। জানুয়ারি মাস। হিমেল আবহাওয়া। তার মধ্যে ও হাসান সাহেব ঘামতে শুরু করেছেন।

দেড়টা বাজে। এতটা দেরি হতে পারেনা। হাসান সাহেব আকাশ এর পাশের রুমের ছেলাটাকে ফোন দিলেন। দুবার রিং বাজতেই ফোন ধরলো ছেলেটা-

“হ্যালো, আসসালামু ওয়ালাইকুম আঙ্কেল। কেমন আছেন?”
“এই তো বাবা। তুমি কেমন আছো?”
“বেশ ভালো আছি আঙ্কেল”।
“বাবা আকাশের ফোন তো বন্ধ পাচ্ছি অনেক্ষন ধরে। ওর কোনও খবর জানো?”
“আঙ্কেল আমি তো ওকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে ক্যাম্পাস এসেছি। ওর তো এতক্ষনে পৌঁছে যাওয়ার কথা”।
“হ্যাঁ পৌঁছে তো যাওয়ার কথা কিন্তু কেন যে এখনো এলো না। আবার মোবাইল ও অফ। কি করবো কিছু বুঝতে পারছি না। আচ্ছা বাবা কোন বাস এ উঠেছিলো বলতে পারবা?”
“হ্যাঁ আঙ্কেল। সপ্তর্ষি পরিবহন। ঠিক সাড়ে দশটায় ছেড়েছে”।
“আচ্ছা বাবা আমি দেখি ওদের কাউণ্টার এ খোজ নিয়ে”।
“আঙ্কেল আমাকে জানাবেন কিন্তু”।
“আচ্ছা বাবা ভালো থেকো”।

টেনশন টা কেন যেন হঠাৎ বেড়ে গেলো হাসান সাহেবের। তরিঘরি করে বেড়িয়ে গেলেন বাসা থেকে। সোজা সপ্তর্ষি পরিবহনের কাউণ্টারে। সেখানে গিয়ে দেখেন সবাই খুব উত্তেজিত। বেশ ভিড়। কোনও মতে ভিড় ঠেলে এগিয়ে যা শুনলেন নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না। পেট্রোল বোমা মাড়া হয়েছিল গাড়িতে, ৩২ জন যাত্রী সহ রাস্তায় দাড়িয়ে আত্মচিৎকার করতে করতে পুড়ে গেছে গাড়িটা। কেও বের হতে পারেনি গাড়ি থেকে। চারিদিক কেমন যেন অন্ধকার হয়ে আসছে। আজ কি সূর্য গ্রহণ নাকি? দিনের বেলা এমন অন্ধকার কেন? হাসান সাহেবের মনে হচ্ছে তিনি বাতসে ভাসছেন। চারিদিক নিস্তব্দ। ঐ তো আকাশ। হাসছে গাধাটা। আকাশের পাশে ওটা কে? আরে রেবেকা এলো কোথা থেকে? রেবেকা তো সেই কবে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছে। আকাশ কে কেন বুকে টেনে নিচ্ছে রেবেকা? তাহলে কি?????

বি.দ্রঃ গল্পটা মাঝামাঝি পর্যন্ত লিখে ফেলে ভাবছিলাম না এভাবে শেষ করবো না। একটা হ্যাপি এন্ডিং দেয়া দরকার। প্রতিবার কাউকে না কাউকে মেরে ফেলতে ভালো লাগে না। কিন্তু কেন যেন এভাবেই শেষ হলো। গল্পটা যখন শেষ করছি, কিবোর্ডে হাত চলছে, কিন্তু মনিটর ঝাপসা। একদিন সব আলোই নিভে যায়। নিভে যেতে হয়। কিন্তু কিছু আলো কেন যেন দ্রুত নিভে যায়, হয়তো নিভিয়ে দেওয়া হয়। গল্পটা এখন পর্যন্ত পেট্রোল বোমায় মারা যাওয়া মানুষ গুলোকে উৎসর্গ করছি।

২৫.০২.২০১৫
খুলনা।